সূরা আল-আদিয়াত পবিত্র কুরআনের ১০০ নম্বর সূরা, যা মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং এতে ১১টি আয়াত রয়েছে। 'আল-আদিয়াত' শব্দের অর্থ 'অভিযানকারী অশ্বরাজি' বা 'ছুটন্ত ঘোড়া'। এই সুমহান সূরায় যুদ্ধের ময়দানে দ্রুতগামী ঘোড়ার শপথের মাধ্যমে মানুষের অকৃতজ্ঞ স্বভাব, ধন-সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত মোহ এবং পরকালে অন্তরের গোপন বিষয় উন্মোচিত হওয়ার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। নিচে এই সূরার আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত দেওয়া হলো।
সূচিপত্র
- সূরা আল-আদিয়াত সম্পর্কে কিছু কথা।
- সূরা আল-আদিয়াত আরবি
- সূরা আল-আদিয়াত বাংলা উচ্চারণ
- সূরা আল-আদিয়াত বাংলা অর্থ
- সূরা আল-আদিয়াত PDF ডাউনলোড
- সূরা আল-আদিয়াত এর ফজিলত
- সূরা আল-আদিয়াত কখন পড়বেন?
- FAQ
সূরা আল-আদিয়াত সম্পর্কে কিছু কথা।
সূরা আল-আদিয়াত মানুষের আত্মকেন্দ্রিক স্বভাব এবং আখেরাতের হিসাবকে ভুলে থাকার প্রবণতার ওপর আলোকপাত করে। যেখানে একটি সাধারণ ঘোড়া সামান্য খাবারের বিনিময়ে নিজের জীবন বাজি রেখে মনিবের আদেশে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেখানে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তার অজস্র নিয়ামত পেয়েও অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এই সূরা মানুষকে পরকালের চূড়ান্ত বিচার ও অন্তরের নিয়তের গভীর হিসাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নিচে সূরা আল-আদিয়াতের আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত আলোচনা করা হলো।
সূরা আল-আদিয়াত আরবি
وَ الۡعٰدِیٰتِ ضَبۡحًا ۙ﴿۱﴾
فَالۡمُوۡرِیٰتِ قَدۡحًا ۙ﴿۲﴾
فَالۡمُغِیۡرٰتِ صُبۡحًا ۙ﴿۳﴾
فَاَثَرۡنَ بِهٖ نَقۡعًا ۙ﴿۴﴾
فَوَسَطۡنَ بِهٖ جَمۡعًا ۙ﴿۵﴾
اِنَّ الۡاِنۡسَانَ لِرَبِّهٖ لَكَنُوۡدٌ ۚ﴿۶﴾
وَ اِنَّهٗ عَلٰی ذٰلِكَ لَشَهِیۡدٌ ۚ﴿۷﴾
وَ اِنَّهٗ لِحُبِّ الۡخَیۡرِ لَشَدِیۡدٌ ؕ﴿۸﴾
اَفَلَا یَعۡلَمُ اِذَا بُعۡثِرَ مَا فِی الۡقُبُوۡرِ ۙ﴿۹﴾
وَ حُصِّلَ مَا فِی الصُّدُوۡرِ ﴿ۙ۱۰﴾
اِنَّ رَبَّهُمۡ بِهِمۡ یَوۡمَئِذٍ لَّخَبِیۡرٌ ﴿۱۱﴾
সূরা আল-আদিয়াত বাংলা উচ্চারণ
- ওয়াল ‘আ-দিয়া-তি দাবহা-।
- ফাল মূরিয়া-তি কাদহা-।
- ফাল মুগীরা-তি সুবহা-।
- ফাআছারনা বিহী নাক‘আ-।
- ফাওয়াছাতানা বিহী জাম‘আ-।
- ইন্নাল ইনছা-না লিরাব্বিহী লাকানূদ।
- ওয়া ইন্নাহূ‘আলা-যা-লিকা লাশাহীদ।
- ওয়া ইন্নাহূলিহুব্বিল খাইরি লাশাদীদ।
- আফালা-ইয়া‘লামুইযা-বু‘ছিরা মা-ফিল কুবূর।
- ওয়া হুসসিলা মা-ফিসসুদূর,
- ইন্না রাব্বাহুম বিহিম ইয়াওমাইযিল্লাখাবীর।
সূরা আল-আদিয়াত বাংলা অর্থ
- কসম ঊর্ধশ্বাসে ছুটে যাওয়া অশ্বরাজির,
- অতঃপর যারা ক্ষুরাঘাতে অগ্নি-স্ফূলিঙ্গ ছড়ায়,
- অতঃপর যারা প্রত্যুষে হানা দেয়,
- অতঃপর সে তা দ্বারা ধুলি উড়ায়,
- অতঃপর এর দ্বারা শত্রুদলের ভেতরে ঢুকে পড়ে;
- নিশ্চয় মানুষ তার রবের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ।
- আর নিশ্চয় সে এর উপর (স্বয়ং) সাক্ষী হয়।
- আর নিশ্চয় ধন-সম্পদের লোভে সে প্রবল।
- তবে কি সে জানে না যখন কবরে যা আছে তা উত্থিত হবে?
- আর অন্তরে যা আছে তা প্রকাশিত হবে।
- নিশ্চয় তোমার রব সেদিন তাদের ব্যাপারে সবিশেষ অবহিত।
সূরা আল-আদিয়াত PDF ডাউনলোড করুন
আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ সহ অফলাইনে পড়ার জন্য PDF ফাইলটি সংরক্ষণ করুন।
📄 PDF ডাউনলোড পেজে যান (Free)সূরা আল-আদিয়াত এর ফজিলত
সূরা আল-আদিয়াত মানুষের আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং পরকালের সচেতনতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত কার্যকরী একটি সূরা। এতে বিশ্বস্ত পশুর দৃষ্টান্ত দিয়ে মানুষের অকৃতজ্ঞতা ও পার্থিব সম্পদের অতিমাত্রায় মোহের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। এ সূরা তিলাওয়াত ও এর অর্থ অনুধাবন করলে মানুষের মন থেকে দুনিয়ার লোভ-লালসা ও কার্পণ্য দূর হয়, আল্লাহর অজস্র নিয়ামতের প্রতি শোকরগুজার হওয়ার মানসিকতা তৈরি হয় এবং কিয়ামতের দিন অন্তরের গোপন রহস্য উন্মোচনের ভয় জাগে, যা মুমিনকে খাঁটি ও সচেতন বান্দা হতে সাহায্য করে।
কুরআন ও হাদিসের তথ্যসূত্র
- কুরআন: সূরা আল-আদিয়াত পবিত্র কুরআনের ১০০তম সূরা (পারা: ৩০, রুকু: ১, আয়াত: ১১, অবতীর্ণের স্থান: মক্কা)। এ সূরায় যুদ্ধক্ষেত্রের অতি বিশ্বস্ত ও দ্রুতগামী ঘোড়ার ক্ষিপ্রতার শপথ করে মানুষের চরম অকৃতজ্ঞ স্বভাব, ধন-সম্পদের প্রতি তীব্র আসক্তি এবং কিয়ামতের দিন কবর থেকে পুনরুত্থান ও অন্তরের গোপন বিষয়াবলী প্রকাশের নিখুঁত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
- হাদিস reference:
- অর্ধেক কুরআনের সমপরিমাণ সওয়াব: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত কিছু বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সূরা আল-যিলযাল ও সূরা আল-আদিয়াতকে এর গভীর অর্থ ও বার্তার কারণে 'অর্ধেক কুরআনের সমতুল্য' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। — (জামে আত-তিরমিজী: ২৮৯৪)
- সম্পদের আসক্তি ও মানবপ্রবৃত্তি: এ সূরায় বর্ণিত মানুষের অতিরিক্ত ধন-সম্পদের মোহের সত্যতা বর্ণনা করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "মানুষ যদি বয়োবৃদ্ধও হয়ে যায়, তবুও তার দুটি বিষয় চিরতরুণ থাকে: একটি হলো সম্পদের লোভ এবং অপরটি হলো দীর্ঘ জীবনের আশা।" — (সহীহ বুখারী: ৬৪২১, সহীহ মুসলিম: ১০৪৭)
- অন্তরের গোপন নিয়ত ও কাজের বিচার: সূরায় বলা হয়েছে কিয়ামতের দিন মানুষের অন্তরে যা লুকিয়ে ছিল তা প্রকাশ করা হবে। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা তোমাদের চেহারা বা বাহ্যিক অবয়বের দিকে তাকান না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর এবং আমলের দিকে তাকান।" — (সহীহ মুসলিম: ২৫৬৪)
সূরা আল-আদিয়াত কখন পড়বেন?
| সময় | আমল ও ফজিলত |
|---|---|
| সকাল | দিনের সূচনায় তিলাওয়াত ও অর্থ অনুধাবন করলে মানুষের অকৃতজ্ঞ স্বভাব এবং সম্পদের প্রতি অন্ধ মোহ দূর হয়, যা সারাদিন আল্লাহর প্রতি শোকরগুজার থাকা এবং নিবেদিত মনে সৎ উপার্জনে ব্যস্ত থাকার প্রেরণা জোগায়। |
| সন্ধ্যা | সন্ধ্যায় তিলাওয়াত করলে সারাদিনের প্রাপ্ত নিয়ামতগুলোর জন্য আল্লাহর প্রতি কৃপণতা না করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অনুভূতি জাগে এবং জাগতিক প্রলোভন থেকে অন্তরকে পবিত্র রাখার তাওফিক মেলে। |
| ঘুমানোর আগে | ঘুমানোর পূর্বে আমল করলে পরকালের বিচার ও কবর থেকে পুনরুত্থানের ভয়াবহ দৃশ্য স্মরণ হয়, যা অন্তরের গোপন পাপের জন্য অনুশোচনা ও খাঁটি নিয়তে তাওবা করে ঘুমাতে সাহায্য করে। |
| নামাজের পরে | ফরজ বা নফল সালাতের কেরাতে বা সালাত পরবর্তী আমলে এ সূরা পাঠ করলে অন্তরে আল্লাহর ভয় সুদৃঢ় হয় এবং বাহ্যিক লৌকিকতা এড়িয়ে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করার মানসিকতা তৈরি হয়। |
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. সূরা আল-আদিয়াত পবিত্র কুরআনের কত নম্বর সূরা এবং এতে কয়টি আয়াত রয়েছে?
সূরা আল-আদিয়াত পবিত্র কুরআনের ১০০ নম্বর সূরা। এটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং এতে সর্বমোট ১১টি আয়াত রয়েছে।
২. 'আল-আদিয়াত' শব্দের অর্থ কী এবং এই সূরার মূল বিষয়বস্তু কী?
'আল-আদিয়াত' শব্দের অর্থ 'অভিযানকারী অশ্বরাজি', 'ধাবমান ঘোড়া' বা 'দ্রুতগামী যুদ্ধাশ্ব'। এই সূরার মূল বিষয়বস্তু হলো মানুষের অকৃতজ্ঞ স্বভাব, ধন-সম্পদের প্রতি তীব্র মোহ এবং কিয়ামতের দিন কবরের লাশ উত্থাপন ও অন্তরের গোপন রহস্য প্রকাশের ভয়াবহ রূপ।
৩. এই সূরায় যুদ্ধক্ষেত্রের ঘোড়ার শপথ করে মানুষের কোন স্বভাবের কথা তুলে ধরা হয়েছে?
এই সূরায় দ্রুতগামী বিশ্বস্ত ঘোড়ার দৃষ্টান্ত দিয়ে মানুষের চরম অকৃতজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। একটি ঘোড়া সামান্য খাবারের বিনিময়ে মালিকের প্রতি অনুগত থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ বাজি রাখে, অথচ মানুষ মহান আল্লাহর অজস্র নিয়ামত ভোগ করেও তাঁর হুকুম অমান্য ও অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
৪. সূরা আল-আদিয়াত অনুযায়ী কিয়ামতের দিন মানুষের অন্তরের অবস্থা কেমন হবে?
সূরা আল-আদিয়াত-এর ৯ থেকে ১১ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন কবর থেকে সকলকে জীবিত করে তুলে আনা হবে এবং মানুষের অন্তরে যা কিছু গোপন নিয়ত বা রহস্য ছিল, তা প্রকাশ করে মহান আল্লাহ পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেবেন।
৫. সূরা আল-আদিয়াত থেকে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কী মূল শিক্ষা পাই?
এই সূরা থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে পার্থিব সম্পদের অন্ধ লোভ পরিহার করা, মহান আল্লাহর প্রতিটি নিয়ামতের প্রতি সর্বদা কৃতজ্ঞ (শোকরগুজার) থাকা এবং লৌকিকতা এড়িয়ে অন্তরের নিয়তকে খাঁটি করে পরকালের চূড়ান্ত হিসাবের জন্য প্রস্তুত হওয়া উচিত।
সম্পর্কিত পোস্ট
- সূরা আল-কারিয়াহ এর আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত
- সূরা আত-তাকাসুর এর আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত
- সূরা আল-আসর এর আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত
- সূরা আল-হুমাযাহ এর আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত
উপসংহার
সূরা আল-আদিয়াত মানবজাতিকে অকৃতজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বের হয়ে মহান আল্লাহর অনুগত ও শোকরগুজার বান্দা হওয়ার আকুল আহ্বান জানায়। ধাবমান অশ্বরাজির বিশ্বস্ততার দৃষ্টান্তের মাধ্যমে এ সূরা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রব্বের অগণিত নিয়ামত ভোগ করেও তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হওয়া এবং পার্থিব ধন-সম্পদের মোহে আখেরাতকে ভুলে থাকা চরম ব্যর্থতা। কিয়ামতের দিন কবরের শায়িতদের উত্থাপন করা হবে এবং অন্তরের সকল গোপন নিয়ত ও রহস্য উন্মোচিত হবে। তাই আসুন, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী লোভ-লালসা ত্যাগ করে আমরা আমাদের নিয়তকে বিশুদ্ধ করি, মহান আল্লাহর প্রতি সর্বদা কৃতজ্ঞ থাকি এবং পরকালের চিরন্তন হিসাব-নিকাশের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করি।