সূরা ফালাক এর আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত

সূরা আল-ফালাক পবিত্র কুরআনের ১১৩তম সূরা এবং এর মোট আয়াত সংখ্যা ৫টি। 'ফালাক' শব্দটির বাংলা অর্থ হলো 'ভোরের আলো' বা 'প্রভাত'। এটি একটি মাক্কী সূরা, যা শয়তানের অনিষ্ট, যাদু-টোনা, কুনজর ও হিংসুকের ক্ষতি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা দেয়। নিচে সূরা ফালাক এর আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


সূচিপত্র


সূরা আল-ফালাক সম্পর্কে কিছু কথা।

সূরা ফালাক নাজিলের প্রেক্ষাপট (শানে নুযূল): সূরা ফালাক নাজিল হওয়ার মূল কারণ বা প্রেক্ষাপট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, লবীদ ইবনে আসাম নামক এক ইহুদি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর জাদুটোনা করেছিল। পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে সূরা ফালাক ও সূরা নাস নাজিল করেন। এই সূরা দুটির মাধ্যমে মহানবী (সাঃ) জাদুটোনা ও অসুস্থতা থেকে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করেন।

মুআউবিযাতাইন বা সুরক্ষার দোয়া: পবিত্র কুরআনের শেষ দুটি সূরা—সূরা ফালাক ও সূরা নাসকে একত্রে 'মুআউবিযাতাইন' বা আশ্রয় চাওয়ার দুটি সূরা বলা হয়। সূরা ফালাকে মূলত চার ধরনের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে সাহায্য ও নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে—সৃষ্টিজগতের সকল সার্বিক ক্ষতি, গভীর রাতের অন্ধকারের বিপদ, জাদুকরদের জাদুটোনা এবং হিংসুকের হিংসা। দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক ও আত্মিক সুরক্ষার জন্য এই সূরাটি পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


সূরা আল-ফালাক আরবি

قُلۡ اَعُوۡذُ بِرَبِّ الۡفَلَقِ ۙ﴿۱﴾

مِنۡ شَرِّ مَا خَلَقَ ۙ﴿۲﴾

وَ مِنۡ شَرِّ غَاسِقٍ اِذَا وَقَبَ ۙ﴿۳﴾

وَ مِنۡ شَرِّ النَّفّٰثٰتِ فِی الۡعُقَدِ ۙ﴿۴﴾

وَ مِنۡ شَرِّ حَاسِدٍ اِذَا حَسَدَ ﴿۵﴾


সূরা আল-ফালাক বাংলা উচ্চারণ

  1. কুল আ‘ঊযুবিরাব্বিল ফালাক
  2. মিন শাররি মা-খালাক।
  3. ওয়া মিন শাররি গা-ছিকিন ইযা-ওয়াকাব।
  4. ওয়া মিন শাররিন নাফফা-ছা-তি ফিল ‘উকাদ।
  5. ওয়া মিন শাররি হা-ছিদিন ইযা-হাছাদ।

সূরা আল-ফালাক বাংলা অর্থ

  1. বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের পালনকর্তার,
  2. তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে,
  3. অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে, যখন তা সমাগত হয়,
  4. গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দিয়ে জাদুকারিনীদের অনিষ্ট থেকে
  5. এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।

সূরা ফালাক এর PDF ডাউনলোড করুন

আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ সহ অফলাইনে পড়ার জন্য PDF ফাইলটি সংরক্ষণ করুন।

📄 PDF ডাউনলোড পেজে যান (Free)

সূরা আল-ফালাক এর ফজিলত

সূরা আল-ফালাক পাঠ করার ফজিলত ও গুরুত্ব অপরিসীম। যেকোনো প্রকার অনিষ্ট, জাদুটোনা, কুনজর, হিংসুক ব্যক্তির হিংসা এবং রাতের বেলা প্রকাশ পাওয়া বিপদ-আপদ থেকে আত্মরক্ষার জন্য এই সূরাটি একটি শক্তিশালী মহাঔষধ ও ঢালস্বরূপ। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক ও আত্মিক সুরক্ষার জন্য এই সূরাটি নিয়মিত পাঠ করার বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন।

কুরআন ও হাদিসের তথ্যসূত্র

  • কুরআন: সূরা আল-ফালাক পবিত্র কুরআনের ১১৩তম সূরা (৩০তম পারা)। সূরা ফালাক ও সূরা নাসকে একত্রে 'মুআউবিযাতাইন' (আশ্রয় লাভের দুটি সূরা) বলা হয়। জাদুটোনার প্রভাব কাটাতে ও শারীরিক-আত্মিক নিরাপত্তার জন্য আল্লাহ তাআলা এই সূরা অবতীর্ণ করেন।
  • হাদিস reference:
    • সহীহ বুখারী (হাদিস নম্বর: ৫০১৭): হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রতি রাতে ঘুমানোর সময় সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে দুই হাতে ফুঁ দিতেন এবং পুরো শরীরে হাত বুলাতেন।
    • সহীহ মুসলিম (হাদিস নম্বর: ৮১৪): উকবা ইবনে আমীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "আজ রাতে আমার ওপর এমন কিছু আয়াত নাজিল হয়েছে, যার মতো আর কখনো দেখা যায়নি। তা হলো— সূরা ফালাক ও সূরা নাস।"
    • সুনানে আবু দাউদ (হাদিস নম্বর: ৫০৮২): সকালে ও সন্ধ্যায় ৩ বার সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করলে তা সকল প্রকার ক্ষতি ও অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য যথেষ্ট হয়।

সূরা আল-ফালাক কখন পড়বেন?

সময় আমল ও ফজিলত
সকাল ফজরের নামাজের পর ৩ বার সূরা ফালাক (সূরা ইখলাস ও নাস সহ) পাঠ করলে সারাদিন যাবতীয় অনিষ্ট, ক্ষতি ও বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
সন্ধ্যা মাগরিবের নামাজের পর ৩ বার পাঠ করলে সারা রাত সব ধরনের অপশক্তি, জাদুটোনা, কুনজর ও অকল্যাণ থেকে আল্লাহর নিরাপত্তায় থাকা যায়।
ঘুমানোর আগে বিছানায় শুয়ে ৩ বার সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে উভয় তালুতে ফুঁ দিয়ে মাথা ও মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে পুরো শরীরে হাত বুলিয়ে নিলে রাতে কোনো অনিষ্ট ক্ষতি করতে পারে না।
নামাজের পরে প্রতিটি ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পর ১ বার সূরা ফালাক পাঠ করা সুন্নাত, যা বান্দাকে সার্বিক নিরাপত্তায় রাখে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. সূরা আল-ফালাক পড়ার মূল উপকারিতা কী?

সূরা আল-ফালাক পাঠ করলে মানুষের হিংসা, বদনজর (কুনজর), জাদুটোনা, শয়তানের চক্রান্ত এবং রাতের অন্ধকারের যাবতীয় ক্ষতি থেকে মহান আল্লাহর কাছে সার্বিক নিরাপত্তা পাওয়া যায়।

২. সূরা ফালাক ও সূরা নাসকে একত্রে কী বলা হয়?

সূরা ফালাক ও সূরা নাসকে একত্রে 'মুআউবিযাতাইন' (المعوذتين) বলা হয়, যার অর্থ হলো "আশ্রয় চাওয়ার বা সুরক্ষার দুটি সূরা"।

৩. কুনজর ও জাদুটোনা থেকে বাঁচতে সূরা ফালাক কীভাবে পড়বেন?

জাদুটোনা ও কুনজর থেকে বাঁচতে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় এবং রাতে ঘুমানোর পূর্বে সূরা ফালাক (সূরা ইখলাস ও সূরা নাস সহ) ৩ বার করে পাঠ করে উভয় হাতে ফুঁ দিয়ে পুরো শরীরে মাসাহ করা বিশেষ কার্যকরী আমল।

৪. সূরা আল-ফালাক কি মাক্কী নাকি মাদানী সূরা?

সূরা আল-ফালাক একটি মাক্কী সূরা। এটি পবিত্র কুরআনের ১১৩তম সূরা এবং এর মোট আয়াত সংখ্যা ৫টি।

৫. প্রতি ফরজ নামাজের পর সূরা ফালাক কতবার পড়া উচিত?

প্রতিটি ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পর ১ বার সূরা ফালাক পাঠ করা সুন্নাত। তবে ফজর ও মাগরিবের নামাজের পর ৩ বার পাঠ করা অধিক ফজিলতপূর্ণ ও সুরক্ষার মাধ্যম।


সম্পর্কিত পোস্ট


উপসংহার

সূরা আল-ফালাক মানবজাতিকে যেকোনো প্রকার দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বিপদ-আপদ, কুনজর, জাদুটোনা এবং হিংসুকের হিংসা থেকে রক্ষার জন্য মহান আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সকাল-সন্ধ্যা, ফরজ নামাজের পর এবং ঘুমানোর আগে এই সূরার সুন্নাত আমলগুলো মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। আসুন, সূরা আল-ফালাকের অর্থ ও গুরুত্ব অনুধাবন করে নিয়মিত পাঠের মাধ্যমে নিজেদের ও পরিবারের সার্বিক আত্মিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করি।