সূরা ফাতিহা এর আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত (Surah Al-Fatiha)

সূরা আল-ফাতিহা পবিত্র কুরআনের ১ম সূরা, যা মক্কা নগরীতে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এতে ৭টি আয়াত রয়েছে। 'ফাতিহা' শব্দের অর্থ সূচনা, প্রারম্ভ বা উদ্বোধন; কারণ এই সূরার মাধ্যমেই পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও গ্রন্থনা শুরু করা হয়। গোটা কুরআনের সারসংক্ষেপ ও শ্রেষ্ঠ দোয়া হিসেবে অবতীর্ণ এই সুমহান সূরাটি প্রতি সালাতে তিলাওয়াত করা ফরজ। নিচে সূরা ফাতিহা এর আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত দেওয়া হলো। আর মুখস্থ করার জন্য নিচে সূরা আল-ফাতিহার আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অনুবাদ সহ PDF Download করার বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।


সূচিপত্র


সূরা ফাতিহা সম্পর্কে কিছু কথা।

বান্দা ও তাঁর স্রষ্টার মধ্যবর্তী নিবিড় যোগাযোগের সবচেয়ে সুন্দর মাধ্যম হলো সূরা আল-ফাতিহা। এই সূরার মাধ্যমে আমরা কেবল আল্লাহর মহিমা ও করুণার প্রশংসাই প্রকাশ করি না, বরং ইহকাল ও পরকালের চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য খাঁটি পথনির্দেশনা কামনা করি। নামাযের প্রতিটি রাকাতে এর তিলাওয়াত মুমিনের হৃদয়কে আল্লাহর আনুগত্যে পূর্ণ করে তোলে। নিচে সূরা ফাতিহার আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত দেওয়া হলো।


সূরা ফাতিহা আরবি

بِسۡمِ اللّٰهِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

اَلۡحَمۡدُ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ۙ﴿۲﴾

الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ۙ﴿۳﴾

مٰلِكِ یَوۡمِ الدِّیۡنِ ؕ﴿۴﴾

اِیَّاكَ نَعۡبُدُ وَ اِیَّاكَ نَسۡتَعِیۡنُ ؕ﴿۵﴾

اِهۡدِ نَا الصِّرَاطَ الۡمُسۡتَقِیۡمَ ۙ﴿۶﴾

صِرَاطَ الَّذِیۡنَ اَنۡعَمۡتَ عَلَیۡهِمۡ ۬ۙ غَیۡرِ الۡمَغۡضُوۡبِ عَلَیۡهِمۡ وَ لَا الضَّآلِّیۡنَ ﴿۷﴾


সূরা ফাতিহা বাংলা উচ্চারণ

  1. বিসমিল্লাহির রহমা-নির রহি-ম।
  2. আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আ -লামি-ন।
  3. আররহমা-নির রাহি-ম।
  4. মা-লিকি ইয়াওমিদ্দি-ন।
  5. ইয়্যা-কা না’বুদু ওয়া ইয়্যা-কা নাসতাই’-ন
  6. ইহদিনাস সিরাতা’ল মুসতাকি’-ম
  7. সিরাতা’ল্লা যি-না আনআ’মতা আ’লাইহিম গা’ইরিল মাগ’দু’বি আ’লাইহিম ওয়ালা দ্দ-ল্লি-ন।

সূরা ফাতিহা বাংলা অর্থ

  1. পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে।
  2. সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিকুলের রব।
  3. দয়াময়, পরম দয়ালু, পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
  4. বিচার দিবসের মালিক।
  5. আপনারই আমরা ইবাদাত করি এবং আপনারই নিকট আমরা সাহায্য চাই।
  6. আমাদেরকে সরল পথ দেখান। পথের হিদায়াত দিন।
  7. তাদের পথ, যাদের উপর আপনি অনুগ্রহ করেছেন। যাদেরকে নিয়ামত দিয়েছেন।যাদের উপর (আপনার) ক্রোধ আপতিত হয়নি এবং যারা পথভ্রষ্টও নয়।

সূরা ফাতিহা PDF ডাউনলোড করুন

আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ সহ অফলাইনে পড়ার জন্য PDF ফাইলটি ডাউনলোড করুন।

📄 PDF ডাউনলোড পেজে যান (Free)

সূরা ফাতিহার ফজিলত

সূরা আল-ফাতিহা পবিত্র কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ ও অত্যন্ত মর্যাদাশীল সূরা। একে 'উম্মুল কুরআন' (কুরআনের মা) ও 'সূরা আশ-শিফা' (আরোগ্যের সূরা) বলা হয়। এটি এমন এক সুমহান সূরা যা ছাড়া আমাদের সালাত বা নামাজ পূর্ণাঙ্গ হয় না। নিয়মিত সঠিক নিয়তে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে অন্তরের ব্যাধি ও শারীরিক রোগ-ব্যাধি থেকে শিফা বা নিরাময় লাভ করা যায়।

কুরআন ও হাদিসের তথ্যসূত্র

  • কুরআন: সূরা আল-ফাতিহা পবিত্র কুরআনের ১ম সূরা (পারা: ১, রুকু: ১, আয়াত: ৭, অবতীর্ণের স্থান: মক্কা)। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হিজরের ৮৭ নম্বর আয়াতে এই সূরার অনন্য মর্যাদা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, "আর আমি তো আপনাকে প্রদান করেছি পুনঃপুনঃ পঠিত সাতটি আয়াত (সূরা ফাতিহা) এবং মহান কুরআন।" — (সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৮৭)
  • হাদিস reference:
    • কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা: আবু সাঈদ ইবনুল মুআল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, "আমি কি তোমাকে কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরাটি শিখিয়ে দেব না? তা হলো 'আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন' (সূরা ফাতিহা)..." — (সহীহ বুখারী: ৪৪৭৪)
    • বান্দা ও আল্লাহর কথোপকথন: আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিসে কুদসীতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "আমি সালাতকে (সূরা ফাতিহা) আমার ও আমার বান্দার মধ্যে দুই ভাগে ভাগ করেছি..." বান্দা যখন প্রতিটি আয়াত পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা সরাসরি তার উত্তর দেন সুবহানআল্লাহ। — (সহীহ মুসলিম: ৩৯৫)
    • রোগ মুক্তির মহৌষধ (শিফা): আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, সাহাবিগণ সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করে সাপে কাটা রোগীকে ঝাড়ফুঁক (রুকইয়াহ) করেন এবং সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই আমল সমর্থন করে এটিকে আরোগ্যের মাধ্যম ঘোষণা করেন। — (সহীহ বুখারী: ৫০০৭)
    • বিশেষ আসমানী নূর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এসে সুসংবাদ দেন যে এমন দুটি বিশেষ 'নূর' তাঁকে দান করা হয়েছে যা পূর্বে কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি; তার একটি হলো সূরা ফাতিহা এবং অপরটি সূরা বাকারার শেষ অংশ। — (সহীহ মুসলিম: ৮০৬)

সূরা ফাতিহা কখন পড়বেন?

সময় আমল ও ফজিলত
সকাল সকালের জিকির ও রুকইয়াহ (ঝাড়ফুঁক) হিসেবে তিলাওয়াত করলে দিনটিতে বরকত নেমে আসে এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত হয়।
সন্ধ্যা সন্ধ্যায় আমল করলে বদনজর, হিংসা, জাদু ও রাতের নানাবিধ ক্ষতিকর প্রভাব বা অপশক্তি থেকে শিফা ও সুরক্ষা লাভ পাওয়া যায়।
ঘুমানোর আগে ঘুমানোর পূর্বে তিলাওয়াত করে শরীরে ফুঁ দিলে আত্মিক প্রশান্তি মেলে, অসুস্থতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং রাতভরের জন্য আল্লাহর নিরাপত্তা হাসিল হয়।
নামাজের পরে ফরজ নামাজের পর অন্যান্য দোয়ার পাশাপাশি সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করলে বান্দার আকুতি সরাসরি সুসংবাদ হিসেবে কবুল হয়।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. সূরা ফাতিহা ছাড়া কি নামাজ আদায় হবে?

না, সালাত বা নামাজে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করা আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্পষ্টভাবে বলেছেন, "যে ব্যক্তি সালাতে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করল না, তার সালাত বাতিল (অসম্পূর্ণ)।" (সহীহ মুসলিম)

২. সূরা ফাতিহাকে 'উম্মুল কুরআন' ও 'সূরা আশ-শিফা' বলা হয় কেন?

'উম্মুল কুরআন' শব্দের অর্থ 'কুরআনের মূল বা সারসংক্ষেপ', কারণ পুরো কুরআনের মূল শিক্ষা এই সূরায় রয়েছে। আর তিলাওয়াত করে ঝাড়ফুঁক করলে নানাবিধ ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভ হয় বলে একে 'সূরা আশ-শিফা' (রোগমুক্তির সূরা) বলা হয়।

৩. সূরা ফাতিহা পড়া শেষে 'আমীন' বলার বিধান কী?

সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত বা শ্রবণ করার পর উচ্চস্বরে বা মনে মনে 'আমীন' বলা সুন্নাত। 'আমীন' শব্দের অর্থ হলো— "হে আল্লাহ! আমাদের দোয়া কবুল করুন।"

৪. এই সূরার আয়াত সংখ্যা কত এবং এটি কোথায় অবতীর্ণ হয়েছে?

সূরা ফাতিহায় সর্বমোট ৭টি আয়াত রয়েছে। বিশুদ্ধ অভিমত অনুযায়ী, এই সুমহান সূরাটি হিজরতের পূর্বে পবিত্র মক্কা নগরীতে পূর্ণাঙ্গভাবে অবতীর্ণ হয়েছে (মক্কী সূরা)।

৫. অসুস্থতার জন্য সূরা ফাতিহা দিয়ে ঝাড়ফুঁক (রুকইয়াহ) করার সঠিক নিয়ম কী?

পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করে অসুস্থ ব্যক্তির শরীরে ফুঁ দেওয়া কিংবা পানিতে ফুঁ দিয়ে তা পান করানো অত্যন্ত কার্যকর এক সুন্নাতী আমল।


সম্পর্কিত পোস্ট


উপসংহার

সূরা আল-ফাতিহা হলো পবিত্র কুরআনের হৃদপিণ্ড ও প্রতিটি মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া। এই সুমহান সূরার মাধ্যমে মমিনগণ সরাসরি মহান আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করে এবং সঠিক ও সরল পথের (সিরাতুল মুস্তাকিম) হেদায়াত প্রার্থনা করে। নিয়মিত সালাতে ও আমলে অনুধাবনপূর্বক সূরা ফাতিহা পাঠের মাধ্যমে অন্তরে ঈমানের আলো বৃদ্ধি পায় এবং আত্মিক প্রশান্তি অর্জিত হয়। তাই আসুন, আমরা এই সূরার অর্থ ও শিক্ষা সঠিকভাবে অনুধাবন করে তা বাস্তব জীবনে চর্চা করি। ইনশাল্লাহ।