সূরা আল-কাফিরুন এর আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত (Surah Al-Kafirun)

সূরা আল-কাফিরুন পবিত্র কুরআনের ১০৯তম সূরা, যা মক্কা নগরীতে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এতে ৬টি আয়াত রয়েছে। 'আল-কাফিরুন' শব্দের অর্থ কাফিরগণ বা সত্য অস্বীকারকারীগণ। এই সুমহান সূরায় তাওহীদের প্রতি একনিষ্ঠতা এবং শিরকের সাথে কোনোরূপ আপস না করার সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। নিচে সূরা আল-কাফিরুন এর আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত দেওয়া হলো।


সূচিপত্র


সূরা আল-কাফিরুন সম্পর্কে কিছু কথা।

শিরকমুক্ত খাঁটি ঈমান গঠন ও আকিদা রক্ষার জন্য সূরা আল-কাফিরুন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই সূরাটিকে 'শিরক থেকে মুক্তির সনদ' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং ফজর ও মাগরিবের সুন্নাত সালাতে নিয়মিত এটি তিলাওয়াত করতেন। প্রতিটি মুমিনের জন্য নিজের ঈমানকে হেফাজত করার এক অমেধ্য শক্তি রয়েছে এতে। নিচে সূরা আল-কাফিরুনের আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অনুবাদ ও ফজিলত দেওয়া হলো।


সূরা আল-কাফিরুন আরবি

قُلۡ یٰۤاَیُّهَا الۡكٰفِرُوۡنَ ۙ﴿۱﴾

لَاۤ اَعۡبُدُ مَا تَعۡبُدُوۡنَ ۙ﴿۲﴾

وَ لَاۤ اَنۡتُمۡ عٰبِدُوۡنَ مَاۤ اَعۡبُدُ ۚ﴿۳﴾

وَ لَاۤ اَنَا عَابِدٌ مَّا عَبَدۡتُّمۡ ۙ﴿۴﴾

وَ لَاۤ اَنۡتُمۡ عٰبِدُوۡنَ مَاۤ اَعۡبُدُ ؕ﴿۵﴾

لَكُمۡ دِیۡنُكُمۡ وَلِیَ دِیۡنِ ﴿۶﴾


সূরা আল-কাফিরুন বাংলা উচ্চারণ

  1. কুল ইয়াআইয়ুহাল কা-ফিরূন।
  2. লাআ‘বুদুমা-তা‘বুদূন।
  3. ওয়ালাআনতুম ‘আ-বিদূনা মাআ‘বুদ।
  4. ওয়ালাআনা ‘আ-বিদুম মা-‘আবাত্তুম,
  5. ওয়ালাআনতুম ‘আ-বিদূনা মাআ‘বুদ।
  6. লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়া দীন।

সূরা আল-কাফিরুন বাংলা অর্থ

  1. বল, ‘হে কাফিররা,
  2. তোমরা যার ‘ইবাদাত কর আমি তার ‘ইবাদাত করি না’।
  3. এবং আমি যার ‘ইবাদাত করি তোমরা তার ‘ইবাদাতকারী নও’।
  4. ‘আর তোমরা যার ‘ইবাদত করছ আমি তার ‘ইবাদাতকারী হব না’।
  5. ‘আর আমি যার ‘ইবাদাত করি তোমরা তার ‘ইবাদাতকারী হবে না’।
  6. ‘তোমাদের জন্য তোমাদের দীন আর আমার জন্য আমার দীন।’

সূরা আল-কাফিরুন PDF ডাউনলোড করুন

আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ সহ অফলাইনে পড়ার জন্য PDF ফাইলটি সংরক্ষণ করুন।

📄 PDF ডাউনলোড পেজে যান (Free)

সূরা আল-কাফিরুন এর ফজিলত

সূরা আল-কাফিরুন তাওহীদ ও একত্ববাদের এক পরম সনদ। এই সুমহান সূরার মাধ্যমে শিরক ও বাতিলের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে তাওহীদের ওপর অবিচল থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত এ সূরা তিলাওয়াত ও আমলের মাধ্যমে ঈমান খাঁটি ও মজবুত হয়, কুফর ও শিরকের প্রভাব থেকে আত্মরক্ষা করা যায় এবং শয়তানের চক্রান্ত থেকে নিরাপত্তা লাভ করা সম্ভব হয়।

কুরআন ও হাদিসের তথ্যসূত্র

  • কুরআন: সূরা আল-কাফিরুন পবিত্র কুরআনের ১০৯তম সূরা (পারা: ৩০, রুকু: ১, আয়াত: ৬, অবতীর্ণের স্থান: মক্কা)। এ সূরায় ইসলাম ও কুফরের অবস্থান স্পষ্টভাবে আলাদা করে দিয়ে শিরকমুক্ত ঈমানের চূড়ান্ত বার্তা ঘোষণা করা হয়েছে।
  • হাদিস reference:
    • শিরক থেকে মুক্তির সনদ: হযরত ফারওয়া ইবনে নওফাল (রাঃ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "তুমি বিছানায় ঘুমানোর সময় সূরা আল-কাফিরুন পাঠ করবে, কারণ এটি শিরক থেকে মুক্তির সনদ।" — (সুনান আবু দাউদ: ৫০৫৫, জামে আত-তিরমিযী: ৩৪০৩)
    • কুরআনের এক-চতুর্থাংশ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "সূরা আল-কাফিরুন পবিত্র কুরআনের এক-চতুর্থাংশের (চার ভাগের এক ভাগ) সমান।" — (জামে আত-তিরমিযী: ২৮৯৩)
    • সুন্নাত সালাতে বিশেষ গুরুত্ব: হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত সালাতে প্রথম রাকাতে সূরা আল-কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা আল-ইখলাস তিলাওয়াত করতেন। — (সহীহ মুসলিম: ৭২৬)
    • তাওয়াফের সালাতে সুন্নাত: হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবীজী (ﷺ) তওয়াফ শেষের দুই রাকাত সালাতেও সূরা আল-কাফিরুন ও সূরা আল-ইখলাস পাঠ করতেন। — (সহীহ মুসলিম: ১২১৮)

সূরা আল-কাফিরুন কখন পড়বেন?

সময় আমল ও ফজিলত
সকাল ফজরের সুন্নাত সালাতে তিলাওয়াত করা সুন্নাত; এটি দিনের শুরুতেই তাওহীদের ওপর অবিচল থাকার অঙ্গীকার নবায়ন করে এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করে।
সন্ধ্যা মাগরিবের সুন্নাত নামাজে অথবা সন্ধ্যার জিকিরে এটি আমল করলে কুফর ও শিরকের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা যায় এবং আত্মিক সুরক্ষা অর্জিত হয়।
ঘুমানোর আগে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্দেশিত সুন্নাত অনুযায়ী বিছানায় গিয়ে এটি পাঠ করলে 'শিরক থেকে মুক্তির সনদ' লাভ হয় এবং ঈমানের নিরাপদে রাত কাটে।
নামাজের পরে নফল, সুন্নাত ও বিতর সালাতে এই সুমহান সূরা তিলাওয়াত করলে অন্তরে একত্ববাদের চেতনা দৃঢ় হয় এবং ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি পায়।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. সূরা আল-কাফিরুন পবিত্র কুরআনের কত নম্বর সূরা এবং এর আয়াত সংখ্যা কত?

সূরা আল-কাফিরুন পবিত্র কুরআনের ১০৯তম সূরা। এটি মক্কা নগরীতে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এতে সর্বমোট ৬টি আয়াত রয়েছে।

২. 'আল-কাফিরুন' শব্দের অর্থ কী এবং এই সূরার মূল বিষয়বস্তু কী?

'আল-কাফিরুন' শব্দের অর্থ কাফিরগণ বা সত্য অস্বীকারকারীগণ। এই সূরার মূল বিষয়বস্তু হলো মহান আল্লাহর একত্ববাদ (তাওহীদ) প্রকাশ করা এবং শিরক ও কুফরের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করা।

৩. সূরা আল-কাফিরুন নাজিল হওয়ার মূল প্রেক্ষাপট বা শানে নুযূল কী ছিল?

কুরাইশ কাফিররা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে প্রস্তাব দিয়েছিল—এক বছর তারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং এক বছর নবীজী তাদের দেব-দেবীর ইবাদত করবেন। কাফিরদের এই আপসপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাওহীদের ওপর অটল থাকার ঘোষণা হিসেবে এই সূরা অবতীর্ণ হয়।

৪. এই সূরাকে 'শিরক থেকে মুক্তির সনদ' বলা হয় কেন?

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাদিসে নির্দেশ দিয়েছেন যে, রাতে ঘুমানোর পূর্বে এই সূরা তিলাওয়াত করলে তা বান্দাকে শিরকের ভয়াবহতা ও প্রভাব থেকে মুক্ত রাখে, তাই একে 'শিরক থেকে মুক্তির সনদ' বলা হয়েছে।

৫. কোন কোন সালাতে সূরা আল-কাফিরুন তিলাওয়াত করা সুন্নাত?

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিয়মিত ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত, মাগরিবের দুই রাকাত সুন্নাত, তওয়াফ পরবর্তী দুই রাকাত সালাত এবং বিতরের সালাতে প্রথম রাকাতে সূরা আল-কাফিরুন তিলাওয়াত করতেন।


সম্পর্কিত পোস্ট


উপসংহার

সূরা আল-কাফিরুন হলো ঈমান ও তাওহীদের ওপর অবিচল থাকার এক পরম মহাসনদ। এই সুমহান সূরার মাধ্যমে মহান আল্লাহ শিরক ও বাতিলের সাথে সমস্ত আপস প্রত্যাখ্যান করে মুমিনদের জন্য একত্ববাদের স্পষ্ট বার্তা দান করেছেন। নিয়মিত অর্থ অনুধাবনপূর্বক সূরা আল-কাফিরুন তিলাওয়াত ও আমলের মাধ্যমে আমাদের ঈমান খাঁটি ও মজবুত হয় এবং যাবতীয় শিরক ও শয়তানি চক্রান্ত থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হয়। আসুন, আমরা দৈনিক সুন্নাতী আমল হিসেবে এই সূরাটি পাঠ করি এবং নিজেদের জীবনকে তাওহীদের সুদৃঢ় আলোয় উদ্ভাসিত করি।