সূরা আল-লাহাব এর আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত (Surah Al-Lahab)

সূরা আল-লাহাব পবিত্র কুরআনের ১১১তম সূরা, যা মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং এতে ৫টি আয়াত রয়েছে। 'আল-লাহাব' শব্দের অর্থ অগ্নিশিখা বা লেলিহান শিখা। এই সূরায় ইসলামের শত্রু আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর ধিক্কারজনক পরিণতি এবং সত্য দ্বীনের বিজয়ের বার্তা ঘোষণা করা হয়েছে। নিচে সূরা আল-লাহাব এর আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত দেওয়া হলো।


সূচিপত্র


সূরা আল-লাহাব সম্পর্কে কিছু কথা।

সূরা আল-লাহাব পবিত্র কুরআনের এক পরম অলৌকিক সূরা, যাতে জীবিত থাকতেই সত্যের শত্রুর ধ্বংসের স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর রাসুলের বিরোধিতাকারীদের পরিণতি যে কত ভয়াবহ হতে পারে, তার স্পষ্ট চিত্র এতে ফুটে উঠেছে। এটি আমাদের বাতিল ও অহংকার ত্যাগ করে সত্যের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা দেয়। নিচে সূরা আল-লাহাবের আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অনুবাদ ও ফজিলত তুলে ধরা হলো।


সূরা আল-লাহাব আরবি

تَبَّتۡ یَدَاۤ اَبِیۡ لَهَبٍ وَّ تَبَّ ؕ﴿۱﴾

مَاۤ اَغۡنٰی عَنۡهُ مَالُهٗ وَ مَا كَسَبَ ؕ﴿۲﴾

سَیَصۡلٰی نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ ۚ﴿ۖ۳﴾

وَّ امۡرَاَتُهٗ ؕ حَمَّالَۃَ الۡحَطَبِ ۚ﴿۴﴾

فِیۡ جِیۡدِهَا حَبۡلٌ مِّنۡ مَّسَدٍ ﴿۵﴾


সূরা আল-লাহাব বাংলা উচ্চারণ

  1. তাব্বাত ইয়াদাআবী লাহাবিওঁ ওয়া তাবব।
  2. মাআগনা-‘আনহু মা-লুহূওয়ামা-কাছাব।
  3. ছাইয়াসলা-না-রান যা-তা লাহাব।
  4. ওয়ামরাআতুহূ; হাম্মা-লাতাল হাতাব।
  5. ফী জীদিহা-হাবলুম মিম মাছাদ।

সূরা আল-লাহাব বাংলা অর্থ

  1. ধ্বংস হোক আবূ লাহাবের দু’হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক।
  2. তার ধন-সম্পদ এবং যা সে অর্জন করেছে তা তার কাজে আসবে না।
  3. অচিরেই সে দগ্ধ হবে লেলিহান আগুনে।
  4. আর তার স্ত্রী লাকড়ি বহনকারী,
  5. তার গলায় পাকানো দড়ি।

সূরা আল-লাহাব PDF ডাউনলোড করুন

আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ সহ অফলাইনে পড়ার জন্য PDF ফাইলটি সংরক্ষণ করুন।

📄 PDF ডাউনলোড পেজে যান (Free)

সূরা আল-লাহাব এর ফজিলত

সূরা আল-লাহাব (বা সূরা আল-মাসাদ) পবিত্র কুরআনের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও অলৌকিক সূরা। এই সূরায় মহান আল্লাহ তাআলা সরাসরি তাঁর প্রিয় রাসূল (ﷺ)-এর হেফাজত করেছেন এবং সত্যের শত্রুদের অপমানজনক পরিণতির কথা ঘোষণা করেছেন। এ সূরা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ঈমান ও তাকওয়া ছাড়া পার্থিব ধন-সম্পদ, বংশমর্যাদা কিংবা সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি আল্লাহর কাছে কোনো কাজে আসবে না।

কুরআন ও হাদিসের তথ্যসূত্র

  • কুরআন: সূরা আল-লাহাব পবিত্র কুরআনের ১১১তম সূরা (পারা: ৩০, রুকু: ১, আয়াত: ৫, অবতীর্ণের স্থান: মক্কা)। এটি কুরআনের অলৌকিক সত্যতার এক অকাট্য দলিল, কারণ এতে আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর ঈমান না এনে জাহান্নামী হয়ে মরার যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
  • হাদিস reference:
    • শানে নুযূল ও সাফাহ পাহাড়ের ঘটনা: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাফাহ পাহাড়ে উঠে কুরাইশদের ডাক দিলেন। তিনি তাদের তাওহীদের দাওয়াত দিলে আবু লাহাব অভিশাপ দিয়ে বলল, "তোমার সর্বনাশ হোক! এজন্যই কি আমাদের ডেকেছ?" এর পরপরই মহান আল্লাহ এই সূরা নাজিল করে তাঁর হাবীবের জবাব দেন। — (সহীহ বুখারী: ৪৯৭১, সহীহ মুসলিম: ২০৮)
    • অলৌকিক সত্যতা: এই সূরা নাজিল হওয়ার পর দীর্ঘ ১০ বছর আবু লাহাব জীবিত ছিল। সে চাইলে ভণ্ডামি করেও নিজেকে মুসলিম দাবি করে কুরআনকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করতে পারত, কিন্তু সে তা পারেনি। কুরআনের ঘোষণা অনুসারেই বদরের যুদ্ধের কয়েকদিন পর এক কঠিন চর্মরোগে সে অপমানজনকভাবে ধ্বংস হয়। — (তাফসীরে ইবনে কাসীর)
    • বংশমর্যাদার নিষ্ফলতা: এই সূরার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ঈমান ছাড়া কেবল উচ্চ বংশ বা রাসুল (ﷺ)-এর নিকটাত্মীয় হওয়াও পরকালে কোনো উপকারে আসবে না, কারণ আবু লাহাব ছিল নবীজীর আপন চাচা। — (তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন)

সূরা আল-লাহাব কখন পড়বেন?

সময় আমল ও ফজিলত
সকাল দিনের শুরুতে তিলাওয়াত করলে সত্যের ওপর অবিচল থাকার প্রেরণা মেলে এবং শত্রুর অনিষ্ট, ষড়যন্ত্র ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে রবের হেফাজতে থাকা যায়।
সন্ধ্যা সন্ধ্যাবেলায় তিলাওয়াত ও অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে পরকালের ভয় ও অহংকার ত্যাগের চেতনা জাগ্রত হয় এবং নেকির পাল্লা ভারী হয়।
ঘুমানোর আগে রাতের আমল হিসেবে তিলাওয়াত করলে প্রতিটি অক্ষরের জন্য ১০টি করে নেকি অর্জিত হয় এবং ধন-সম্পদের ক্ষণস্থায়িত্বের কথা স্মরণ করে আত্মশুদ্ধি ঘটে।
নামাজের পরে যেকোনো ফরজ, সুন্নাত বা নফল সালাতের কেরাতে এ সূরা পাঠ করলে ঈমানী চেতনা সুদৃঢ় হয় এবং সত্যান্বেষী থাকার বিশেষ দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. সূরা আল-লাহাব পবিত্র কুরআনের কত নম্বর সূরা এবং এতে কয়টি আয়াত রয়েছে?

সূরা আল-লাহাব পবিত্র কুরআনের ১১১তম সূরা। এটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং এতে সর্বমোট ৫টি আয়াত রয়েছে। এই সূরাটি 'সূরা আল-মাসাদ' নামেও পরিচিত।

২. 'আল-লাহাব' শব্দের অর্থ কী এবং এই সূরার মূল বিষয়বস্তু কী?

'আল-লাহাব' শব্দের অর্থ অগ্নিশিখা বা লেলিহান শিখা। এই সূরার মূল বিষয়বস্তু হলো ইসলামের কট্টর শত্রু আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর ধ্বংসের ঘোষণা এবং সত্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের অশুভ পরিণতির বার্তা।

৩. সূরা আল-লাহাব নাজিল হওয়ার শানে নুযূল বা প্রেক্ষাপট কী ছিল?

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন সাফাহ পাহাড়ে উঠে কুরাইশদের তাওহীদের দাওয়াত দেন, তখন আবু লাহাব অভিশাপ দিয়ে কটু কথা বলে। তার সেই কটু কথার জবাবে এবং প্রিয় নবী (ﷺ)-কে সান্ত্বনা দিতে মহান আল্লাহ এই সূরা নাজিল করেন।

৪. এই সূরায় আবু লাহাবের স্ত্রীর কথা কেন উল্লেখ করা হয়েছে?

আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল নবীজী (ﷺ)-এর চলাচলের পথে কাঁটা বিছিয়ে কষ্ট দিত এবং দ্বীনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করত। তাই এ সূরায় তাকে 'খড়ি বহনকারী' আখ্যা দিয়ে জাহান্নামে তার গলায় শক্ত দড়ির শাস্তির কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

৫. সূরা আল-লাহাব থেকে আমরা কী মূল শিক্ষা লাভ করতে পারি?

এই সূরার মূল শিক্ষা হলো—ঈমান ও সৎকর্ম ছাড়া কেবল বংশমর্যাদা, প্রভাব বা বিপুল ধন-সম্পদ আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারে না। সত্যের বিরোধিতা করার পরিণাম সর্বদা ভয়াবহ ও অপমানজনক।


সম্পর্কিত পোস্ট


উপসংহার

সূরা আল-লাহাব পবিত্র কুরআনের এক অনবদ্য অলৌকিক সূরা, যা মানবজাতির জন্য এক মহা শিক্ষণীয় বার্তা বহন করে। এই সূরা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, কেবল উচ্চ বংশমর্যাদা, সামাজিক প্রভাব কিংবা বিপুল ধন-সম্পদ মানুষকে আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষা করতে পারে না; বরং ঈমান ও সৎকর্মই হলো আখেরাতে মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি। সত্যের চিরন্তন বিজয় এবং বাতিল ও অহংকার পতনের করুণ পরিণতি ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি এ সূরা আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে সত্যের ওপর অবিচল থাকার শিক্ষা দেয়। আসুন, আমরা এই সূরার মর্মার্থ অনুধাবন করে হিংসা, অহংকার ও সত্যের বিরোধিতা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ঈমান ও তাকওয়ার জীবন গঠন করি।